12 November 2015

হৃদপিন্ড

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী
চোখ ভিজে ঝাপসা হয়ে আসছিল দৃষ্টি, বারংবার চোখ মুছতে হচ্ছিল। সাত পৃষ্ঠার সুইসাইড নোট লিখতে লিখতে ভোরের ফজরের আযান দিচ্ছিল তখন। লেখা শেষ হলে ঘুমিয়ে পড়েছি ক্লান্তিতে। স্বপ্নে দেখছি লাশকাটা ঘরে শুয়ে আছি। ফ্লোরটি বরফশীতল, পিঠে ঠাণ্ডা অনুভব করছিলাম খুব।  আমার বুক চিরে ডাক্তার ও ডোম পরস্পর বলাবলি করছে :
- স্যার, এইডা কেমুন লাশের বুক ফাড়লাম?
- কেন কি হয়েছে?
- স্যার, হ্যায় তো জীবিত। মরে নাই।
- কি বলো?
-ঠিকি কইছি স্যার। এই পরথম দ্যাখতাছি এই রহম কেইছ! এই দ্যাহেন স্যার হ্যার দুইটা রিদপিন্ডো। একটা দ্যাখতাছি ছ্যাঁকায় ছ্যাঁকায় পোড়া কইলার লাহান হইয়া গেছে। আরেকটা দ্যাহেন খালি 'মা' 'মা' 'মা' নাম জপতেয়াছে।  জীবনে এত লাশ কাটছি, এই রহম গরম শইলের লাশ কক্ষনো পাই নাই।
- তাই তো!  অবাক ঘটনা বটে! -স্যার, একটা অনুরুধ করি?
- বলো।
-হ্যার বুকটা সিলাই কইরা  বাড়িত পাডায় দেন। পোলাডা মনে হয় মা'রে খুব ভালোবাসে।
যখন ঘুম ভাঙলো তখন বেলা প্রায় দশটা। প্রচন্ড ঘেমে বিছানার চাদর ভিজে চপচপে হয়ে আছে। বেডসাইড টেবিলে  হাতের কাছেই দুইশত ইনোকটিন ট্যাবলেট আর ঢাকনা খুলে রাখা জলের জগ পড়ে আছে,আপন মনে হাসলাম। বাইরে উঠোনে লোকজনের কথা বলার শব্দ চেচামেচি শুনতে পেলাম।  তারপর দরজা খুলে বাইরে বের হয়েছি। উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, গৃহকর্মী সুখোর মা আমাকে দেখেই বললো, "ও ঠাকুর, তোমার চোখ দেহি জবা ফুলির মতোন লাল হইয়ে আছে। চোখ উঠিছে নাকি?" বড় উঠানের কোণের গোয়ালঘরের সামনে তাকিয়ে দেখি বড় গরুটার একটা এঁড়ে বাছুর হয়েছে। কাজের লোক দুটো ব্যাতিব্যস্ত দৌড়াদৌড়ি করছে। দিদিভাই দোতালার ঝুল বারান্দা থেকে হাঁক ছেড়ে বললো, "ও মাতুব্বর তোমার সেজো মামারে মোবাইল কইরে জানাও আইড়ে বাছুর হইছে।"
আমি নিচের উঠোন থেকে দিদিভাইর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। ভাবছি, এতক্ষণে বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে সাতাশ বার অজ্ঞান হতো। বুঝলাম, এই জীবন শুধু একা আমার না। এই জীবনের বাঁচা মরার সাথে অনেকের সুখ-দু:খ জড়িয়ে আছে।