13 November 2015

একালের দধীচি

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী
সকালের মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছিলাম। যে ক'দিন গ্রামে থাকি, চেষ্টা করি ভোরের বেলা হাঁটতে। যেতে যেতে গ্রামের আরও গভীরে যাচ্ছি। কপালের বাঁ-দিকটায় একটু একটু করে রোদ্দুরের আঁচ বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে । এ সপ্তাহের অন্য অনেক দিনের তুলনায় মনটা একটু ভালো আজ। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিক দিয়ে পিচঢালা যে রাস্তাটি চলে গেছে সেটি ধরেই দ্রুততম গতিতে এগোচ্ছি। ঘাম শুরু হয়ে গেছে, গলা শুকিয়ে আসছে বলে রাস্তার পাশের টিউবওয়েল চেপে জলতেষ্টা মেটালাম। তারপর হাঁটছি তো হাঁটছিই। বাঁ-দিকটায় তাকালেই কিলোমিটার দূরের ময়নামতি সেনাছাউনীর আওতাধীন অনুচ্চ পাহাড়শ্রেণী উঁকি দিচ্ছে আমাকে দেখে । লালমাটির পাহাড়ের সবুজকে একটু একটু করে হলুদে গ্রাস করে নিচ্ছে। পাশাপাশি অনেকগুলো বহুতল ভবনের সারি, ওগুলো সরকারী কোয়ার্টার সম্ভবত। যেখান থেকে মাটির রাস্তা শুরু হয়েছে, এখানটায় এলেই সবকিছু জুড়িয়ে যায় আমার। যেদিকে তাকাই সবুজ আর সবুজ। একপাশে কালভার্টে বসে বিড়ি ফুঁকছে দুই বখাটে যুবক, আমাকে দেখতে পেয়ে লুকিয়ে ফেলবার চেষ্টা। আচমকা ধুলো উড়িয়ে ভোস্ করে পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল লম্বা একটি মাইক্রোবাস। ক্যান্টনমেন্টের কোনো এক স্কুলে ফুলকুঁড়িদের নিয়ে যাচ্ছে। এদিকটায় শিক্ষার হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ভালোই লাগছে বিষয়টি ভেবে, বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে। এখানকার মানুষের জীবন যাত্রা স্বাভাবিক সুস্থ ও সুন্দর আর এখানকার পরিবেশ অনেক সৌহার্দ্যপূর্ণ। কিন্তু আমায় এবার ফিরতেই হবে। যেখানটায় থেমেছিলাম, সেখানকার চারপাশ ঘুরে ভালো করে তাকিয়ে সবুজ আর পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে ফেরার পথ ধরেছি। একটু এগিয়েছি এমন সময় দেখি কাঁধে ঘাসের বোঝা নিয়ে মাঠের হাঁটুসমান জল-কাঁদা ভেঙ্গে উঠে আসছেন এক বৃদ্ধ। চেনা মনে হওয়াতে দাঁড়িয়ে পড়লাম, দেখি ওপাড়ার বজ্র কাকু। আমার স্বর্গীয় পিতার সমবয়সী হবেন। ছোটবেলায় দেখেছি, উনি মাছ বিক্রি করতে যেতেন আমাদের পাড়ায়। গো-খাদ্যের সন্ধানে খুব ভোরে বেরিয়েছিলেন।গত ক’দিনের অতিবর্ষণে ডুবে যাওয়া জমিগুলোর আলের ওপরে জন্মানো লম্বা ঘাস পরম যত্নে কেটে এনেছেন। তিনি এখনো দারুনভাবে লড়ে যাচ্ছেন নট আউট।প্রতিদিন গরুর দুধ নিয়ে বাজারে যান, খুব দ্রুত ফিরে আসেন ।দ্রুতই বিক্রি হয়ে যায় তার পণ্য । তিনি জীবনে কখনো ভেজালের সাথে আপোষ করেননি, এটি সবার কাছে প্রমাণিত ।ভেজাল নামক অসুরের বিরুদ্ধে এই বৃদ্ধের লড়ে যাওয়াকে আমি কুর্ণিশ জানাই অহর্নিশ ।ভেতর থেকেই উথলে উঠে এলো আবেগ, শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এলো।
দধীচি ছিলেন পুরাণোক্ত একজন মহামুনি।অসুরেরা তখন স্বর্গরাজ্য দখল করে নিয়ে তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে । তিনি দেবতাদের কল্যাণার্থে নিজের দেহ দান করেছিলেন। তাঁর অস্থি দিয়ে বজ্র নির্মাণ করেছিলেন দেবতারা। সেই বজ্র ব্যবহার করা হয়েছিলো অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে।
 আমি আজ মহামুনি দধীচির ছবি তুললাম।